মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চায় ব্যতিক্রমী আয়োজন পাবনায়
নিজস্ব প্রতিনিধি, পাবনামেইল টোয়েন্টিফোর ডটকম:
পাবনায় শিক্ষার্থীদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ছড়িয়ে দেবার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চায় জেলার বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষকদের সাথে চলছে মতবিনিময় ও উদ্ধুদ্ধকরণ কর্মশালা। রণাঙ্গণের মুক্তিযোদ্ধাদের মুখ থেকে মুক্তিযুদ্ধের দুঃসাহসী সব গল্প শিক্ষকদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়বে জেলার হাজারো শিক্ষার্থীদের মাঝে এমন প্রত্যাশার কথাই জানালেন আয়োজকরা।
বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে ধারাবাহিকভাবে জেলার ৯ উপজেলায় সকল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চলবে এ কার্যক্রম। সোমবার বিকেলে কর্মশালার উদ্বোধনী আয়োজনে রাধানগর মজুমদার একাডেমী স্কুল এন্ড কলেজের মিলনায়তনে গিয়ে দেখা যায় রাধানগর মজুমদার একাডেমী, ইছামতি হাই স্কুল, জান্নাত বিবি জুবলী হাই স্কুল, মহিম চন্দ্র জুবলী হাই স্কুলের দেড় শতাধিক শিক্ষক সমবেত হয়েছেন। রীতিমত খাতা কলম নিয়ে পরীক্ষা দিতে বসেছেন। হঠাৎ এমন চিত্র দেখে ছাত্র কিংবা চাকুরীপ্রার্থী মনে হলেও,প্রকৃতপক্ষে তারা পাবনার বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের ইতিহাস নিয়ে নৈবর্ত্ত্যকি ও রচনামূলক প্রশ্নের এমন পরীক্ষাতেই এখন অবতীর্ণ হতে হচ্ছে তাদের। পরীক্ষাপত্র মূল্যায়ণ করছেন রণাঙ্গণের মুক্তিসেনারা। শোনাচ্ছেন যুদ্ধদিনের দুঃসাহসী বীরত্বগাঁথা। প্রশ্ন ছিল শিক্ষকদের নিয়ে কেন এই আয়োজন। উত্তরে পাবনা জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন জানালেন, শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁরা খুব সহজেই পৌছাতে পারেন্। শিক্ষার্থীরা তাদের কথা গুরুত্ব সহকারে শোনে। আমরা যতই বক্তৃতা করি না কেন, যতই প্রামাণ্য চিত্র বানাই তার চেয়ে অনেক বেশী ফলপ্রসূ হবে যদি একজন শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে তা আলোচনা করেন। তবে, দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য আমাদের অনেক শিক্ষকই মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানেন না। স্থানীয় পর্যায়ের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তো হারিয়েই যেতে বসেছে। তাই শিক্ষকদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিভিন্ন প্রামাণ্য চিত্র ও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বই পাঠ করানোর এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
মতবিনিময় সভায় শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে শিক্ষকদের নির্দেশনা দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনার পাশাপাশি পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য দেয়া হচ্ছে পুরস্কার। আকস্মিক এ পরীক্ষায় কিছুটা বিব্রত হলেও,গুরুত্ব উপলব্ধি করে সাধুবাদ জানিয়েছেন অংশ গ্রহণকারী শিক্ষকরাও।
রাধানগর মজুমদার একাডেমীর অধ্যক্ষ গোলাম কিবরিয়া বলেন, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথা শিক্ষার্থীদের কাছে তুলে ধরা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু, আজকের এ কর্মশালায় বোঝা গেল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সঠিক ভাবে আমাদের অনেক শিক্ষকেরই জানা নেই। কর্মশালার প্রামাণ্য চিত্র ও মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধদিনের গল্প শুনে শিক্ষকরা উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। স্থানীয় পর্যায়ের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে আগ্রহী হয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আগামী প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে এ আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেই মনে করছেন সুধীসমাজ ও মুক্তিযোদ্ধারা।
এ প্রসঙ্গে, পাবনা ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা বেবী ইসলাম বলেন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের আত্মত্যাগ ও পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের নৃশংস নির্যাতনের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসীকতার কথা, প্রতিরোধের কথা নতুন প্রজন্ম ভুলতে বসেছে। লাখো শহীদের রক্তে যে রাষ্ট্রের জন্ম, সে ইতিহাস না জানলে দেশপ্রেমহীন স্বার্থপর একটা প্রজন্ম সৃষ্টি হবে। শিক্ষকদের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ছড়িয়ে দেবার অনন্য উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবী রাখে। তবে, মাধ্যমিক পর্যায়ে সহপাঠ্য হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অধ্যয়ন বাধ্যতামূলক করারও দাবী জানান এই বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আলোচনায় শিক্ষকদের উদ্বুদ্ধ করণের এমন আয়োজনে ধারাবাহিক ভাবে সম্পৃক্ত করা হবে জেলার সকল পর্যায়ের শিক্ষকদের। আর এতে করে জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় ইতিহাস চর্চায় নতুন প্রজন্ম উদ্ধুদ্ধ হবে বলে মত সংশ্লিষ্টদের।


কোন মন্তব্য নেই