Pabna



কামরুজ্জামান- আপনার জন্য আমার নীল বেদনা

ফারুক হোসেন চৌধুরী
একযুগেরও বেশি সময়ের সাংবাদিকতা পেশা ছেড়ে আকস্মিকভাবে বর্তমান কর্মস্থলে যোগদান করলাম, নয় বছর আগে। তখন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সবেমাত্র যাত্রা শুরু করেছে। হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম শহরের একটি বাড়িতে। বসার জায়গা নেই। বসার কক্ষ নেই। আপাতত বারান্দাতেই একটি চেয়ারটেবিল নিয়ে বসতে হল। তখন যারা কক্ষ পেয়েছিলেন তাদেরকে ভাগ্যবান মনে করতাম। টেবিল চেয়ারে কাজের ফাঁকে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ছিল সময় কাটানোর প্রধান উপায়। কতক্ষন আর বসে থাকা যায়। এদিকে ওদিকে ঢু মারা শুরু করলাম। একদিন পরিকল্পনা ,উন্নয়ন  ওয়ার্কস দপ্তরে গেলাম। দরজার সামনে অনুমতির জন্য অপেক্ষা করতেই প্রথমে চোখে পড়ল টাক মাথার ফর্সা এক ভদ্র লোককে। পাশে আরেকজন। ভীতরে গেলাম। আন্তরিকভাবে গ্রহণ করলেন তাঁরা। প্রথম যাকে দেখেছিলাম- পরিচিত হয়ে জানতে পারি প্রকৌশলী কামরুজ্জামান তাঁর নাম। পাশেরজন পরিকল্পনা দপ্তরের প্রধান গোলজার স্যার। কামরুজ্জামানকে আমার ভালো লেগে গেল। হাসিখুশি প্রাণবন্ত স্বপ্নবাজ এক মানুষ। কাজের প্রতি আর  অসম্ভব ঝোক। প্রথমদিনের পরিচয়েই তিনি আমাকে আপন করে নিলেন।
তারপর শুরু হল তার কক্ষে আমার আড্ডা। আমি আড্ডাবাজ এক মানুষ। এমন লোক পেলে আড্ডা আমার জমে যায়। জানাশোনা হলো। আমরা একই ব্যাচের ছাত্র। বয়সটাও কাছাকাছি। বাড়ি চাপাইনবাবগঞ্জে হওয়ায় এটা নিয়ে মজা করতাম।  আমাদের সময়ে যারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন তারা জানেন পাবনা গ্রুপ আর চাপাইগ্রুপ বলে ক্যাম্পাসে একটি কথা প্রচলিত ছিল। মজা করে চাপাই নিয়ে অনেক কথা বলতাম। এভাবেই আমাদের কাছে আসা। ধীরে ধীরে আমরা সহকর্মী থেকে কাছের বন্ধু হয়ে গেলাম কখন বুঝি নাই। কাজের বাইরে নানা বিষয়ে কথা হতো আমাদের। তখনকার ভিসি মহোদয়ের সরাসরি ছাত্র ছিলেন কামরুজ্জামান। আর আমি ভিসি মহোদয়ের পূর্ব পরিচিত হওয়ায় দুইজন যখন একসাথে ভিসি মহোদয়ের কক্ষে প্রবেশ করতাম স্যার নানা বিষয়ে উপদেশ দিতেন। আমাদেরকে সন্তানের মতো দেখতেন- সেজন্য তাঁর শাসনের পাশাপাশি ভালোবাসাও পেতাম। তখন ভিসি স্যারের একান্ত সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের কারণে সবার সাথে যোগাযোগ রাখতে হতো।  ভিসি স্যার নতুন একটি ভাড়া বাড়িতে ল্যাবের কাজ শুরু করলেন। পুরো দায়িত্ব দিলেন কামরুজ্জামানের উপরে। আমাকে বললেন তুমি  মাঝে মধ্যে ল্যাবে যেও। সময় পেলেই যেতাম,দেখতাম কামরুজ্জামান কাজ নিয়ে ব্যস্ত। কীভাবে ল্যাবকে ভালো করা যায়- সর্বাধুনিক প্রযুক্তি যথাযথস্থানে স্থাপন করা যায় সেসব চিন্তা। ভিসি স্যারের নির্দেশকে তিনি দাপ্তরিক কাজ ছাড়াও বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে নিয়ে রাঘবপুরের বসুন্ধরা মোড়ের সেই ল্যাব দাড় করিয়ে ফেললেন । এক সময় তাকে গ্রীন হাউজের অফিস ছেড়ে ল্যাবের এক কক্ষে অফিস স্থাপন করতে হলো। অফিস সময়ে প্রায়ই আসতেন স্যারের কাছে নানা সমস্যা নিয়ে। সব সময় বলতেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কি  কি সমস্যা হচ্ছে ল্যাবে। নিজের সমস্যা নিয়ে তাঁকে স্যারের কাছে কম বলতেই শুনেছি।
একটা প্রবাদ আছে এরকম  কোন মানুষের মুখে যদি সবসময় হাসি থাকে তাহলে সে অনেক কিছুই জয় করতে পারেন। সেই মিষ্টি হাসি ছিল কামরুজ্জামানের প্রধান অস্ত্র। দেখা হলেই আগে হাসি দিতেন। তারপর শুরু করতেন মজা করা। নানা বিষয় নিয়ে কথা বলতেন। রাজনীতি তার আগ্রহের বিষয় ছিল। চাপাই এলাকার নানা তথ্য আমাদের বলতেন। তাঁর শিক্ষক তৎকালিন ভিসি মোজাফ্ফর হোসেন স্যারের ক্লাস করতে গিয়ে কী কী অভিজ্ঞতা হয়েছিল তা শেয়ার করতেন। অনেক সময় স্যারের দুই একটি ভাষা অবিকল উচ্চারণ করতেন। তখনকার ভিসি স্যার আমাদের এক মহান অভিভাবক। বিশ্ববিদ্যালয়কে গড়ে তোলার কাজে দিনরাত কাজ করছেন। আমরা তার সহযাত্রী। ছুটাছুটি এটা নেই তো ওটা নেই। বার বার কামরুজ্জামানের ডাক পড়ত ভিসি দপ্তরে। আমিই তাকে ডাকতাম স্যারের সাথে দেখা করতে- ডাক পাওয়া মাত্র হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতেন। একদিন ডাক পেয়েই গায়ে কাদামাটি নিয়ে চলে এলেন। ভিসি স্যার তো অবাক। জিজ্ঞেস করলেন বিষয়টি কী?-  চাপাইয়া ভাষায় উত্তর দিলেন- স্যার কাজ করছিলাম পরিস্কার হওয়ার সময় পাই নাই। তাই এভাবেই চলে এসেছি। ভিসি স্যারকে তিনি বসের চাইতেই বেশি কিছু ভাবতেন। পিতার চোখে দেখতেন। স্যারের আদেশ পালন ছিল তাঁর কাছে সর্বাধিকার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের বর্তমান জায়গা পাওয়ার পর পরের দিন মাপজোক হবে। সীমানা বুঝে নেয়ার দায়িত্ব পড়ল আমাদের কয়েকজনের উপর। বিবিএ বিভাগের কামরুজ্জামান স্যার সাথে ছিলেন। মাঠে হাটু পানি- সাথে কাঁদা, কে আগে নামবে কাঁদার মধ্যে-বিস্তির্ণ মাঠে। আমরা রাস্তার উপরে বসে আছি। আমাদেরকে উৎসাহ দিলেন কামরুজ্জামান। তিনি নিজেই আগে নামলেন। জমি মাপার শেকল নিজে বয়ে চললেন মাঠের মধ্যে। আমরা তার পিছে পিছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যেখানে এখন সীমানা প্রাচীর সেখানে কামরুজ্জামানের পায়ের চিহ্ন আজও আমরা দেখতে পাই। যারা প্রথমে এখানে এসেছি। এভাবে কত স্মৃতি কামরুজ্জামানের এই ক্যাম্পাসে তথা বিশ্ববিদ্যালয়ে।বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ নেই- খোঁজ নাও কামরুজ্জামান। টেলিফোন নষ্ট খোঁজ নাও কামরুজ্জামান- ভিসি স্যারের নির্দেশ।
এক সময়ে শহরের বাড়ি ছেড়ে বর্তমান ক্যাম্পাসে আবাস, স্থাপনা-অফিস স্থাপিত হলো আমাদের। আমরা নতুন উদ্যোমে শুরু করলাম। কিন্তু ততদিনে কর্পোরেট হাউজের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ- অফিস ব্যবস্থাপনা। আগের ভিসি মহোদয়ও নেই। বিরুপ পরিবেশে কামরুজ্জামান। কিন্তু যার মেধা আর প্রতিভা আছে তাকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। তাঁর ভীতরের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন গবেষণা নিয়ে কাজ শুরু করলেন। পাটের বিকল্প আঁশ তৈরীতে নেমে গেলেন। প্রাথমিকভাবে সফলও হলেন। তাঁর নিজ জেলা চাপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসনের এক সভায় তিনি পাটের বিকল্প আঁশ উদ্ভাবনের বিষয়টি দেখিয়ে সবাইকে চমকিয়ে  দিলেন। জেলা প্রশাসক তাঁকে সর্বাত্বক সহযোগিতা করার আশ্বাস দিলেন। কিন্তু বিধাতার নির্মম  পরিহাস একদিন চাপাইয়ের জেলা প্রশাসক নিজেও দায়িত্ব পালন কালে মারা গেলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর গবেষণার বিষয়টি তুলে ধরে বারবার সহযোগিতার আবেদন জানালেও বিফল হয়েছেন। তারপর ঢাকায় বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করতে শুরু করলেন। তখন তাঁর মাথার মধ্যে গবেষণার ভুত চেপে ধরেছে। বেতনের টাকা খরচ করে বিভিন্ন জায়গায় প্রজেক্ট দাখিল করতেন। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক নানা জটিলতা আর বিষয়টি নতুন হওয়ায় তার চেষ্টা সফলতার মুখ দেখেনি। তিনি বারবার আমাকে বলতেন সাংবাদিকদের বলে একটি রিপোর্ট করতে। ২/১টি টিভি চ্যানেল আর সংবাদপত্র এ বিষয়ে রিপোর্ট প্রচার করলেও সাড়া জাগাতে পারেনি। তাতে তিনি দমে যাননি। চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। আঁশের গবেষণার পাশাপাশি ইট ভাটার ধোয়া নিয়ে গবেষণায় মেতে ওঠেন। কিন্তু ভাগ্য তার সহায় ছিল না। তাঁর গবেষণার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানলেও সহযোগিতা করেনি। অথবা তিনি কর্তৃপক্ষকে ‘ম্যানেজ’ করতে পারেননি। আমিও তার জন্য একটি রিপোর্ট লিখতে পারি নাই। কাউকে দিয়ে লেখাতেও পারি নাই। সেই কষ্ট আমাকে কুড়ে কুড়ে খায় এখন। তাঁর গবেষণার রিপোর্ট না লিখলেও তাঁর শোক সংবাদ আমাকে লিখতে হয়েছে। এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে। ক্ষমা কী পেতে পারি কামরুজ্জামান আপনার কাছে? আপনার মতো মহান মানুষ হয়তো আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। কিন্তু আমি নিজেকে কী  ক্ষমা করতো পারবো? আমি এই কষ্ট সারাজীবন বয়ে বেড়াব। এত কাছের  মানুষ হয়েও আপনার গবেষণা নিয়ে আমি কিছু লিখতে পারি নাই।
 কর্পোরেট মিডিয়া আর আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন তাঁর গবেষণা নিয়ে সাড়া না দিলেও কামরুজ্জামান ভীতরে ভীতরে থেমে থাকেন নি। ঢাকার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নানাভাবে চেষ্টা করতেন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তাঁর গবেষণার ফল আলোর মুখ দেখেন নি। সর্বশেষ গত ৪ মার্চ তিনি গবেষণার কাজের প্রজেক্টের খোঁজ নেয়ার জন্য ঢাকায় যান। পরের দিন ৫ মার্চ মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকাস্থ গেষ্ট হাউজে মারা যান। কামরুজ্জামানের মৃত্যু কী স্বাভাবিক? না ব্যর্থতার কষ্ট বুকে নিয়ে বেড়াতে বেড়াতে এক সময়  তাঁর প্রিয় গবেষণার মৃত্যুর মতো সেও মারা গেলেন। তাঁর ডাক আমরা কেউ শুনি নি। অথবা তিনি আমাদের শোনাতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁর ব্যাথা আমরা বুঝতে পারি নি। তাঁকে সমাজ- রাষ্ট্র না বোঝার কষ্ট  কামরুজ্জামান বয়ে বেড়িয়েছেন। আমরা কেবল তাঁর বাহ্যিক অবয়ব দেখেছি- মজা করেছি- হাঁসিমুখে কথা বলেছি। সবাই আশ্বাস দিয়েছেন কিন্তু তিনি গবেষকের মর্যাদা পাননি। এমনকি তাঁর পেশাগত মর্যাদাও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার শিকলে আবদ্ধ। সে কষ্টও তিনি ইদানিং বলতেন। নানাবিধ বঞ্চনার কারণে ত্যক্ত বিরক্ত হয়েই কী কামরুজ্জামান একবুক কষ্ট নিয়ে চলে গেলেন। অনেকেই আমরা তাঁকে বুঝতাম না। আমাদের সংকর্ণী সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁকে বুঝতে চাইনি।
৫মার্চ যখন তাঁর মৃত্যুর কথা শুনলাম। মনে হলো আমার চারপাশ থেমে গেছে। অনেক আপন একজনকে হারিয়েছি আমি- আমরা। অনেক কষ্টেও কান্না সামলাতে পারি নাই। আমাদের ধুসর করে কামরুজ্জামান হয়তো নক্ষত্র হয়ে আছেন সাত আকাশে। আমরা আপনার সহকর্মীরা অনেকেই হয়তো আপনাকে ভুলে গেছি- বা যাচ্ছি কিন্তু একেবারেই ভুলে যাবে না এই বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার পিছনে আপনার ভূমিকা আমরা যারা দেখেছি তারা মনে রাখব। আপনি বেঁচে থাকবেন আপনার সহকর্মীদের মাঝে। সর্বোপরি মাননীয় উপাচার্য মহোদয় আশ্বাস দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আপনার পরিবারের সম্পর্ক দৃঢ় করার। আমরা সেই আশ্বাসে বুক বেধে আছি। আপনার জন্য আমাদের ভালোবাসা অসীম। আপনার জন্য আমাদের ভালোবাসার কমতি নেই। আপনি আমার কেউ না, রক্তের সম্পর্কের কোন আত্মীয় নন। কিন্তু আপনি আমার-আমাদের সহকর্মীদের জীবনের বড় একটা অংশ জুড়ে ছিলেন। ছিলেন পরমাত্মীয়। আপনার চলে যাওয়ায় তাই আমি পরিণত হয়েছি নীল বেদনায় আছন্ন মানুষের মতো। আপনার জন্য কাঁদছে আপনার সহকর্মীরা। আপনি বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে। আপনার দুই সন্তান আনিকা আর মাহির সর্বোপরি ভাবী মনজিলার মধ্যে বেঁচে থাকবেন।  আপনার গবেষণা হয়তো একদিন অন্য এক গবেষকের মাধ্যমে সফলতা পাবে। তাতে দেশ উপকৃত হবে। মানুষ উপকৃত হবে। আপনি সবসময় দেশ ও মানুষের মঙ্গল কামনা করতেন। আল্লাহ আপনার মঙ্গল করবেন।  আপনার আদর্শকে ধরে রাখব আমরা । ভালো থাকবেন কামরুজ্জামান।

কোন মন্তব্য নেই