Pabna



সুজানগরে মেলার নামে অশ্লীল নৃত্য র‌্যাফেল ড্র’য়ের নামে জুয়া-নিংস্ব হচ্ছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠি

বিশেষ প্রতিনিধি, পাবনামেইল টোয়েন্টিফোর ডটকম: 
পাবনার সুজানগরে মেলায় র‌্যাফেল ড্রয়ের নামে ডিজিটাল জুয়া চলছে গত দুই মাস ধরে। লোভে পরে নিঃস্ব হচ্ছে ওই এলাকার ক্ষুদ্র  ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠি। সন্ধ্যায় ড্র দেখতে মানুষের ভিড় সুজানগর বাসষ্ট্যান্ডের দেশীয় হস্ত শিল্প মেলার এই জুয়া। র‌্যাফেল ড্রয়ের কোনও অনুমোদন না থাকলেও মেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে বিক্রি করা হচ্ছে টিকিট। প্রতিটি টিকিট কিনতে হচ্ছে ২০ টাকায়। পুরস্কারের আশায় টিকিট কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন শিক্ষার্থী, দিনমজুরসহ সর্বস্তরের মানুষ। র‌্যাফেল ড্র-এর কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছে স্থানীয় ক্যাবল টিভি নেটওয়ার্কে। গত পহেলা বৈশাখ থেকে প্রকাশ্যে র‌্যাফেল ড্র চললেও ব্যবস্থা নিচ্ছে না স্থানীয় প্রশাসন। এদিকে আমিনপুর থানা পুলিশের অনুমতি নিয়ে এ্কই উপজেলার আহমেদপুর ইউনিয়নের চরগোবিন্দপুরেও চলছে একই ষ্টাইলে চলছে এই অভিনব জুয়া।
একাধিক স্থানীয়রা জানান, জেলা প্রশাসনের অনুমোদন নিয়ে সুজানগর পৌরসভার পরিত্যাক্ত বাসষ্ট্যান্ডে মাসব্যাপী দেশীয় হস্তশিল্প ও বৈশাখী মেলা চলছে। গত পহেলা বৈশাখ স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান শাহিনুজ্জামান শাহিন ও পৌর মেয়র আব্দুল ওয়াহাবসহ স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এই মেলার উদ্বোধন করেন। 
মেলায় স্থান পেয়েছে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের হস্তশিল্প ও কসমেটিকস স্টল, শিশুদের খেলার জন্য নানা রাইডস এবং দৈনিক র‌্যাফেল ড্র। প্রতিদিন আড়াই শত সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও ভ্যানে মাইকিং করে সুজানগর ছাড়াও পার্শ্ববর্তী পাবনা সদর, আটঘরিয়া, চাটমোহর, সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলায় এই র‌্যাফেল ড্রয়ের টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত টিকিট বিক্রি শেষে রাত ৯টার পর র‌্যাফেল ড্রয়ের পুরস্কার কার্যক্রম স্থানীয় ক্যাবল টিভি নেটওয়ার্কে সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছে। সরাসরি সম্প্রচারের কারণেই র‌্যাফেল ড্রয়ের নামে ডিজিটাল জুয়া জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা। বিষয়টি অবৈধ হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তারা। তবে স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন প্রশাসন ডেইলী নির্ধারিত হরে উৎকোচ পাওয়ার নিশ্চয়তায় চুপ রয়েছেন।
ক্যাবল টিভিতে দেখানো হচ্ছে র‌্যাফেল ড্র’ সোমবার রাতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ৫টি মোটরসাইকেল পুরষ্কারের কথা বলে র‌্যাফেল ড্রয়ের টিকিট বিক্রি করছেন মামুন নামের এক ব্যাক্তি। তিনি জানান, র‌্যাফেল ড্রয়ে মানুষকে আগ্রহী করতেই আজকের ৫টি মোটরসাইকেল পুরস্কার রাখার কথা বলা হচ্ছে। 
তিনি আরও জানান, র‌্যাফেল ড্রতে অনেক পুরস্কার রয়েছে। মাত্র শুরু করা হয়েছে মেলা, আগামীে আরো লোভনীয় পুরষ্কার দেওয়অ হবে। তন্মোধ্যে স্বর্ণের হারসহ মোটরসাইকেল, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন পুরস্কার রয়েছে।
দুলাই বাজারে অটোভ্যানে বিক্রি করছেন অপর একজন। তিনি জানান, মেলার শুরুতে প্রথম দিনেই তিনি প্রায় এক হাজার টিকিট বিক্রি করেছেন। যতই দিন যাবে টিকিট বিক্রি বাড়বে। ড্রয়ের কার্যক্রম স্থানীয় ক্যাবল চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচার করায় এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বলে তিনি জানান।
স্থানীয় কাশিনাথপুর বাজার এলাকার বাসিন্দা সোলায়মান মিয়া জানান, সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পাবনার এই কয়েকটি উপজেলার অলিগলিতে র‌্যাফেল ড্রয়ের টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। অনেকেই প্রতিদিন একাধিক টিকিট কিনছে পুরস্কারের লোভে। রাত ১০টার পর বিভিন্ন গলিতে মানুষ ভিড় জমায় টিভিতে সরাসরি র‌্যাফেল ড্রয়ের ফলাফল দেখার জন্য।

সাঁথিয়া উপজেলার আড়িয়াডাঙ্গি গ্রামের গৃহবধূ জোসনা খাতুন আক্ষেপের সাথে বলেন, স্বর্ণের গহনার কথা শুনে আমার পালিত তিনটি হাঁস বিক্রি করে টিকিট কেটেছিলাম, অথচ আমার কপালে গহনা তো দূরে থাক কিছুই বাধে নেই।  
নগরবাড়ি ঘাট এলাকার ব্যবসায়ী রতন মিয়া জানান, তার দোকানের পাঁচ কর্মচারী নিয়মিতই র‌্যাফেল ড্রয়ের টিকিট কিনছে। একেক জন ১০ থেকে ১৫টা পর্যন্ত টিকিট কিনলেও এখন পর্যন্ত কোনও পুরস্কার পায়নি। র‌্যাফেল ড্রয়ের নামে এটি জুয়া ছাড়া আর কিছুই না। গত দেড়মাস ধরে বেড়া সিএন্ডবি মোড়েও এই ব্যবসা চলে, আবার সুজানগরেও শুরু হয়েছে। ব্যবসাটা মনে হয় খুবই লাভজনক 

বেড়া উপজেলার কাজিরহাটের এক হোটেল কর্মচারী ওয়াসিম জানান, তিনি প্রতিদিন হোটেলে কাজ করে ৪০০ টাকা পান। এই টাকা থেকে প্রতিদিনই ১০ থেকে ১২টা টিকিট কিনছেন। মোটরসাইকেলের আশায় তিনি টিকিট কিনছেন বলে জানান।

মেলার আয়োজক সুজানগর উপজেলা চেয়ারম্যান শাহিনুজ্জামান শাহিন বলেন, জেলা প্রশাসনের অনুমোদন নিয়েই মেলা চালানো হচ্ছে। র‌্যাফেল ড্র সীমিত আকারে চলছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘এটি কোনোভাবেই জুয়ার মধ্যে পরে না। 

পাবনার পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, সুজানগর উপজেলা ছাড়া আর কোথাও কোন র‌্যাফেল ড্র চলছে না। চরগোবিন্দপুর বাজারে চলার কথা শুনে পুলিশ তাৎক্ষনিক ভাবে বন্ধ করে দেয়। তবে এ জন্য আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি কোথাও। তারপরও সুজানগরে কেন চলছে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। 
পাবনা জেলা প্রশাসক মোঃ জসিম উদ্দিন বলেন, জুয়া, অশ্লীল নৃত্য পরিবেশনে নিষেধাজ্ঞাসহ কয়েকটি শর্ত সাপেক্ষে সুজানগরে দেশীয় হস্ত শিল্প মেলার জন্য এক মাসের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। র‌্যাফেল ড্র কিংবা জুয়ার কোনও অনুমোদন দেওয়া হয়নি উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক আরো বলেন, শর্ত বহির্ভূত কাজ করা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে র‌্যাফেল ড্র ও সার্কাসের নামে প্রতিদিনই বি গ্রেডের চিত্রনায়িকা ও মডেল এনে নৃত্য করা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের আশ্বাস দেন। 

কোন মন্তব্য নেই