কে এই এনাম বিশ্বাস? পাকশী জুড়ে যার অপরাধ সাম্রাজ্য
বিশেষ প্রতিনিধি, পাবনামেইল টোয়েন্টিফোর ডটকম:
পাকশী ইউনিয়ন জুড়ে অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন এনামুল হক বিশ্বাস ওরফে এনাম চেয়ারম্যান। বালু বাণিজ্য, বালু উত্তোলন, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, পারমানবিক প্রকল্পের জমির ক্ষতিপূরণের সিন্ডিকেট গড়ে তোলা, পারমানবিক প্রকল্পের নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত গাড়ি সরবরাহ, নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহ, প্রকল্পে শ্রমিক নিয়োগ, নিজস্ব বাহিনী দিয়ে সাধারণ মানুষকে মারধর, মিথ্যা ও হয়রানীমূলক মামলা দায়েরসহ সকল অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত রয়েছে এনাম বিশ্বাসের নাম। সর্বশেষ পাকশীর বিভিন্ন হত্যাকান্ডের সঙ্গেও এনাম বিশ্বাস ও তার আত্মীয় স্বজনরা জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে পুরো ঈশ্বরদীতে।
এনাম বিশ্বাসের দুই ছেলে, ভাতিজা, ভাগ্নেসহ তাঁর পরিবার ও বংশের লোকজন পাকশী জুড়ে অপরাধের সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। অবৈধ উৎস হতে এনাম গং এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। এনামের অবৈধ টাকা আর ক্ষমতার দাপটে কাছে পাকশী ও রূপপুরের মানুষ এখন অসহায়। এনাম গং এর অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে নির্মম নির্যাতন এমনকি দিতে হচ্ছে জীবন।
পাকশী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এনাম বিশ্বাস অথচ তিনি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের চেয়েও তিনি বেশি প্রভাবশালী। এনামের অবৈধ প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের অনেকেই তার প্রতি তিক্ত-বিরক্ত। কিন্তু তারা প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। কেউ প্রতিবাদ করলেই কৌশলে তাকে হুমকি, মারধর ও মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানী করা হয়।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দলের কতিপয় প্রভাবশালী নেতার ছত্রছায়ায় এনাম চেয়ারম্যান ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। পারমাণবিক প্রকল্পের কাজ শুরুর পূর্বেই বিবিসি বাজারের বিশ্বাস পাড়া এলাকায় পদ্মা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে কোটি কোটি টাকা মালিক হয়ে বনে যান এই এনাম বিশ্বাস। এরপর ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়নে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেন এনাম। একের পর এক অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে তাঁর লোকজন।
পাকশী ও রূপপুর এলাকার পদ্মা নদীর বেশ কয়েকটি স্পট থেকে এক সময় বালু উত্তোলন করতেন এনাম বিশ্বাস। প্রশাসনের নজরদারীর কারণে পাকশী এলাকায় বালু উত্তোলন বন্ধ হয়ে গেলে হার্ডিঞ্জ ব্রীজের পাশে বিশাল বালু বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেন তিনি। এই বালু মহাল থেকে দুইশত থেকে তিনশত ট্রাক বালু প্রতিদিন বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। বালুর গাড়ি প্রতি দুই থেকে তিনশ টাকা চাঁদা আদায় হয়। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ চাঁদার এই অর্থ নিয়ন্ত্রণ করেন এনামের নিজস্ব লোক হিসেবে পরিচিত হিটলু।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে শ্রমিক নিয়োগ, পণ্য ও যাত্রীবাহী গাড়ি সরবরাহ, পাথর, বালুসহ বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহে এনামের একগুচ্ছ আধিপত্য। এনামের ভাতিজা আব্দুল্লাহ আল বাকী ওরফে আরজু পারমাণবিক প্রকল্পের এসব কাজ দেখভাল করতেন। এছাড়াও শ্রমিক নিয়োগ বাণিজ্য করেন এনামের ভাগ্নে আনোয়ার হোসেন ওরফে আরিফ।
রূপপুর প্রকল্পে পদ্মার চরের ৯৯০ একর খাস জমিতে চাষাবাদকারী কৃষকদের ক্ষতিপূরণের নামে প্রায় ২৮ কোটি টাকা লোপাটের মূলহোতা এনাম চেয়ারম্যান। ক্ষতিগ্রস্ত ভুয়া কৃষকের ৭৭৫ জনের তালিকা নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠে। অবশেষে নানা ফাঁক ফোকর পেরিয়ে এনাম বিশ্বাসের নেতৃত্বে কৃষকদের নামে ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তোলন শুরু হয়। কয়েক দফা টাকা উত্তোলন ইতিমধ্যে হয়েছে। ক্ষতিপূরণের এই টাকা নিয়েও স্থানীয়দের নানা অভিযোগ রয়েছে।
পাকশী ও রূপপুরে বালু উত্তোলন বন্ধ হওয়ার পর সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সাঁড়া এলাকায় পদ্মা নদী থেকে বালু উত্তোলন করেছেন এনাম বিশ্বাস। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদী রক্ষা বাঁধ হুমকির মুখে পরতে পারে এমন আশংকা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পাকশী জুড়ে এখন এক আতংকের নাম এই চেয়ারম্যানের ক্যাডার রকি বিশ্বাস। এনাম বিশ্বাসের ছোট ছেলে রকি পাকশীর অঘোষিত রাজপুত্র। তাঁর বিরুদ্ধে মাদক বাণিজ্য ও স্থানীয়ভাবে নিজস্ব বাহিনী গড়ে তুলে সে অপকর্ম করে বেড়াচ্ছেন। রূপপুরে একজন আইনজীবীর বাড়ি ভাড়া নিয়ে সেই বাড়িতে অনৈতিক কর্মকান্ড করার অভিযোগও রয়েছে রকির বিরুদ্ধে। রূপপুর পারমানবিক প্রকল্পের মাটি ভরাট কাজে বাঁধা ও চাঁদা দাবি করায় ২০১৭ সালে ৩০ এপ্রিল আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ৩০ রাউন্ড গুলিসহ গ্রেফতার হয় রকি। কারাগার থেকে বেরিয়ে সে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে। রকির বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও রয়েছে। এনাম বিশ্বাসের বড় ছেলে রনি বালু বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। এছাড়াও বেশ কিছু ঠিকাদারী কাজকর্মও সে দেখাশুনা করেন।
৬ ফেব্রুয়ারি রাতে পাকশী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফিজুর রহমান সেলিম হত্যার পর ফুঁসে উঠেছে পাকশী ও রূপপুরের মানুষ। এ হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ এনাম বিশ্বাসের ভাতিজা আরজু বিশ্বাসকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করেছেন। আরজু স্থানীয়ভাবে পাকশীর অপরাধ জগতের শিরোমনি হিসেবে পরিচিত। তাঁর বিরুদ্ধে আরো একটি হত্যা মামলা রয়েছে। এছাড়াও রূপপুরের মানুষজন এখন আওয়াজ তুলতে শুরু করেছেন পাকশীর অপরাধ জগতের শিরোমনি আরজু বিশ্বাস ছাত্রলীগ নেতা লাবলু ও পিন্টু হত্যার সঙ্গেও জড়িত থাকতে পারে। পুলিশ রিমান্ডে থাকা আরজুকে এসব হত্যাকান্ড সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের দাবিও জানিয়েছেন রূপপুরের মানুষ। সেলিম হত্যাকান্ডের পর এনাম বিশ্বাসের থলের বিড়াল বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।
এমনকি মুক্তিযোদ্ধা সেলিম হত্যাকান্ডের সঙ্গে এনাম বিশ্বাসও জড়িত আছেন বলে স্থানীয় অনেকেই মন্তব্য করছেন।
নিহত সেলিমের পুত্র তানভীর রহমান তন্ময় রূপপুর বিবিসি বাজারে এক প্রতিবাদ সভায় এনাম চেয়ারম্যানকে অভিযুক্ত করে বলেন, এনাম চেয়ারম্যান তাদের বাড়িতে গিয়ে রূপপুরে প্রকল্পের কৃষকের ক্ষতিপূরণের টাকার ব্যাপারে বাবাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রূপপুরের একাধিক ব্যক্তি বলেন, এনাম কেন প্রভাবশালী, কারা রয়েছে তার পেছনে এটা সবাই জানে। এনাম বিশ্বাসের কাছে রূপপুর ও পাকশীর মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা সেলিম হত্যা মামলায় জড়িত আরজু বিশ্বাস অবৈধ টাকার জোরে বেরিয়ে আসতে পারে বলেও অনেকেই আশংকা প্রকাশ করেছেন।
পাকশী ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, চেয়ারম্যান এনামুল হক বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে এতে দলের নেতাকর্মীরা বিব্রত।
পাকশী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হাবিবুল ইসলাম হব্বুল বলেন, এসব বিষয় নিয়ে নতুন করে কিছু বলতে চাই না। আপনারা সাংবাদিকরা সবাই সবই জানেন। পত্র-পত্রিকায় অনেক খবর এসেছে। তাই নতুন করে কিছু বলার আছে বলে মনে করি না।
এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে এনামুল হক বিশ্বাস বলেন, আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ সত্য নয়। মুক্তিযোদ্ধা সেলিম হত্যার সঙ্গে আমার কোন সর্ম্পক নেই। ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

কোন মন্তব্য নেই